সুখ-শান্তি সমস্ত মানুষের চাওয়া…

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
আলহামদু লিল্লাহি নাহমাদুহূ ওয়া নাস্তাঈনুহ ওয়া নাস্তাগফিরুহু ওয়াছাল্লাল্লাহু… ‘আলাইহি ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়া আছহাবিহী ওয়া বারাকা ও সাল্লামা তাসলীমান কাছীরা, আম্মা বা’দ।
আল্লামা শেখ শিহাব উদ্দীন (পলাশের হুজুর) খলীফা হযরত আমীরে শরীয়ত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর বাংলাদেশ ও বিশ্ব মুসলমানের প্রতি উদাত্ত আহবান:
চারটি বিষয় আমরা গুরুত্বসহকারে পালন করলে দুনিয়ার যত অশান্তি, পেরেশানী, হানাহানী, মারামারি, রক্তারক্তি, বিভেদ, বৈষম্যসহ সমস্ত খারাবী দূর হবে ইনশাআল্লাহ।
১। নামাজ কায়েম করা
২। যাকাত আদায় করা
৩। সৎ কাজে আদেশ করা
৪। অসৎ কাজে নিষেধ করা
নামাজ কায়েম ও যাকাত আদায় করা:
আল্লাহ তায়ালার এরশাদ:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ
(আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়) [সুরা বাকারা: আয়াত ৪৩]
অন্য জায়গায় এরশাদ হয়েছে:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّـهِ ۗ إِنَّ اللَّـهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
(তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্যে পূর্বে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তোমরা যা কিছু কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা প্রত্যক্ষ করেন) [সুরা বাকারা: আয়াত ১১০]
অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
(নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎকাজ করেছে, নামায প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত দান করেছে, তাদের জন্যে তাদের পুরষ্কার তাদের পালনকর্তার কছে রয়েছে। তাদের কোন শঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না) [সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৭]
হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে:
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন যে, আল্লাহ তায়ালা ফরমাইয়াছেন, আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করিয়াছি এবং প্রতিঙ্গা করিয়াছি যে, যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময় মত গুরুত্ত সহকারে আদায় করিবে আমি তাহাকে নিজ দায়িত্বে জান্নাতে প্রবেশ করাইব। আর যে ব্যক্তি গুরুত্ত সহকারে এই নামাজসমুহ আদায় করিবে না, তাহার ব্যাপারে আমার কোন দায়িত্ব নাই। (দুররে মানসুর : আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ)
নবী-রাসুলগণ আল্লাহর সত্তা ও গুনাবলী মহাত্ত ও অনুগ্রহসমুহ, পবিত্রতা ও একত্ববাদ সম্পর্কে যা বলেছেন তা মেনে চলা এবং ঈমান আনার প্রথম সহজাত দাবি এই যে, মানুষ যেন নিজকে তাঁর জন্য উৎসর্গ করে, ইবাদাত, ভালবাসা ও বিনয় নম্রতা প্রকাশ করে, তাঁর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে এবং তাঁকে স্মরণের মধ্য দিয়ে নিজ অন্তর আত্মাকে জ্যোতির্ময় করে তোলে। এটাই সালাতের প্রকৃত বিষয়বষ্তু। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সালাত শ্রেষ্ট মাধ্যম। আর এজন্য প্রত্যেক নবী-রাসুলের শিক্ষা এবং শরী’আতে আনার পর প্রথম করণীয়রূপে সালাতকে নির্ধারিত করা হয়েছে। তাই সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত শরী’আতেও সালাতের শর্তাবলী, রুকনসমুহ, সুন্নাতসমুহ, নিয়মকানুন এবং সালাত ভংগের ও মাকরুহ হওয়ার বিষয় সবিষ্তার গুরুত্ত সহকারে বর্ণিত হইয়াছে। একে এমন গুরুত্ত দেওয়া হইয়াছে যা অন্য কোন ইবাদতকে দেওয়া হ্য়নি।
অন্যত্র হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে:
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন যে, আল্লাহ তায়ালা বিত্তবানদের উপর তাহাদের ধন-সম্পদের মধ্যে সেই পরিমাণই ফরয করিয়াছেন যাহা তাহাদের গরীবদের জন্য যথেষ্ট এবং তাহাদিগকে ক্ষুধার্ত ও নগ্ন থাকা অবস্থায় তাহাদের কষ্টের মধ্যে না ফেলে। কিন্তু বিত্তবানেরা সেই পরিমাণ ও আটক করিয়া রাখে। ভালভাবে শুনিয়া রাখ আল্লাহ তায়ালা বিত্তবানদের নিকট হইতে কঠিন হিসাব গ্রহণ করিবেন।
আল্লাহ তায়ালা গায়েবের সবকিছু সম্পর্কে অবহিত হওয়া সত্বেও যাকাতের যেই পরিমাণ নির্ধারিত করিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট। যদি এই পরিমাণ যাকাত যথাযথভাবে আদায় করা হয় এবং ধনীদের নিকট হইতে তোলা হয় তাহা হইলে কোন মানুষ ক্ষুধায় কষ্ট পাইবে না এবং পোষাকের অসুবিধা কাহারও থাকিবে না।
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা
আল্লাহ তায়ালার এরশাদ:
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
(আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।) [সুরা আল ইমরান: আয়াত ১০৪]
অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ
(তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।) [সুরা আল ইমরান: আয়াত ১১০]
হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে:
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তশরীফ আনিলেন, আমি তাঁহার চেহারা মোবারক লক্ষ্য করিয়া বুঝিতে পারিলাম, নিশ্চয় গুরুত্তপূর্ণ কোন ব্যাপার দেখা দিয়াছে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাহারও সাথে কোনরূপ কথাবার্তা না বলিয়া ওযু করিয়া মসজিদে তশরীফ নিয়া গেলেন। আমি তাঁহার কথা শুনিবার জন্য ঘরের দেওয়ালে গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া গেলাম। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে তশরীফ রাখিলেন। অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করিয়া এরশাদ ফরমাইলেন: “হে লোকসকল ! আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করিতে থাক, নতুবা এমন সময় হ্য়ত আসিয়া পড়িবে যখন তোমরা দোয়া করিবে কিন্তু উহা কবুল করা হইবে না, তোমরা সওয়াল করিবে কিন্তু উহা পুরণ করা হইবে না, তোমরা শত্রুর বিরুদ্ধে আমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিবে কিন্তু আমি তোমাদিগকে সাহায্য করিব না।” হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পবিত্র কথা কয়টি বলিয়া মিম্বর হইতে নামিয়া আসিলেন। (তারগীব : ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)
অন্যত্র হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে তাহাদের দৃষ্টান্ত ঐ লোকদের মত যাহারা এক জাহাজের যাত্রী এবং লটারীর মাধ্যমে জাহাজের শ্রেণী নির্ধারিত হইয়াছে। কিছুলোক উপর তলায় আছে আর কিছুলোক নীচতলায় আছে। নীচতলাবাসীদের পানির প্রয়োজন হইলে উপর তলায় যাইয়া পানি আনিতে হয়। যদি তাহারা ইহা মনে করে যে, আমাদের বারবার যাওয়া-আসার কারনে উপর তলাবাসীদের কষ্ট হয়, অতএব আমরা যদি আমাদের অংশে অর্থাৎ জাহাজের নীচ দিয়া সমুদ্রে একটি ছিদ্র করিয়া লই, তবে পানি এইখানেই পাওয়া যাইবে; উপর তলাবাসীদের কষ্ট দিতে হইবে না। এমতাবস্থায় উপর তলার লোকেরা যদি নীচতলার আহম্মকদিগকে এই কাজে বাধা না দেয় আর মনে করে যে, তাহাদের কাজ তাহারা বুঝিবে তাহাদের সহিত আমাদের কি সম্পর্ক ; তাহা হইলে জাহাজ ডুবিয়া যাইবে এবং উভয় দলই ধ্বংস হইয়া যাইবে। আর যদি তাহাদিগকে বাধা দেয় তবে উভয় দল ডুবিয়া যাওয়া হইতে রক্ষা পাইবে। (বুখারী, তিরমিযী)
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ইসলামের একটি অন্যতম আমল। এই আমলের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্যই পৃথিবীতে আম্বিয়া আলাইহিমুসসালামগনের আগমন ঘটিয়াছিল। তাঁহারা আমরে বিল মা’রূফ ও নেহী আনিল মুনকার তথা “সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের বিধান মানুষের নিকট পৌছাইয়া দিয়াছেন। পৃথিবীতে নবীগনের আগমনের ধারা বন্ধ হইয়া যাওয়ার পর এই দায়িত্ব ওলামায়ে কেরামের উপর অর্পিত হইয়াছে। মুসলমানদের দ্বীন ও ঈমানের প্রশ্নে এই আমলের আবশ্যকতা কতটা গুরুত্ববহ এই প্রসঙ্গে কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট হইতে পারে যে, মানুষ যদি অবহেলা বশে এই আমল পরিত্যাগ করে, তবে দুনিয়াতে নবীগনের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যহত হইয়া দ্বীনের ভিত্তি দুর্বল হইয়া পড়িবে এবং সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে চরম অবক্ষয় ও গোমরাহী ছড়াইয়া পড়িবে। দ্বীনের এই আহাম ও গুরুত্বপূর্ণ আমলের অনুপস্থিতির কারণে মানুষ ক্রমে আল্লাহর বিধান হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পাপাচার-অনাচার ও ফেৎনা-ফাসাদের কঠিন তমসায় আচ্ছন্ন হইয়া পড়িবে এবং এক পর্যায়ে মানুষের অপরাধ অনুভূতি লোপ পাইয়া এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হইবে যে, মানুষ আল্লাহ পাকের অসংখ্য নাফরমানী করিবার পরও উহাকে কোন অপরাধই মনে করিবে না।
বর্তমান সময়ে সম্ভবত: আমাদের সেই আশংকাই বাস্তবে প্রমাণিত হইতেছে। দ্বীনের এই বুনিয়াদী আমল সম্পর্কে মানুষের ধারণা ক্রমেই লোপ পাইতেছে এবং কালক্রমে মানুষ ইহার আমল একেবারেই পরিত্যাগ করিতে বসিয়াছে। মানুষ এখন সৃষ্টিকর্তা খালেকের বন্দেগী ত্যাগ করিয়া মানুষেরই গোলামী করিতে শুরু করিয়াছে। দ্বীনের সহীহ সমঝ ও আমল হইতে দূরে সরিয়া পড়ার কারণেই মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি এখন চতুষ্পদ জন্তুর নিকৃষ্টতাকেও হার মানাইতেছে। ভূ-পৃষ্ঠে এমন সত্যিকার ঈমানদার নিতান্ত দুর্লভ হইয়া পড়িতেছে, যাহারা সব রকম বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকুলতা উপেক্ষা করিয়া আল্লাহ পাকের বিধানের উপর কায়েম থাকিতে সচেষ্ট হইবে। এহেন নাজুক সময়ে যাহারা সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে দ্বীনের হাল ধরিয়া মানুষের মাঝে আবারো নবীওয়ালা আমল জারীর মেহনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিবে, তাহারা আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে মহান পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করিবে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাকে, আপনাকে এবং সবাইকে ছহীহ সমঝ দান করুন এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৈফিক দান করুন,আমীন ।
অধম আল্লামা শেখ শিহাব উদ্দীন (পলাশের হুজুর রহঃ)
খলীফা হযরত আমীরে শরীয়ত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ)
খতীবঃ পলাশ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ
পলাশ, নরসিংদী, মোবাইল: ০১৭৩৩৭১১১০৫
Leave a Reply